Saturday, December 3, 2011

উচ্ছ্বল হাসির রসায়ন

ঈষৎ হাসি কিংবা অট্টহাসি মূলত প্রফুল্ল মনের চিত্রই আমাদের সামনে তুলে ধরে। আমাদের অভিব্যক্তিতে তখন বয়ে যায় অফুরন্ত আনন্দধারা। চোখ-মুখ উৎফুল্ল হয়ে ওঠে উচ্ছ্বাস আর খুশির জোয়ারে। ঈষৎ হাসিতে মুখের পেশিতে ভাঁজ পড়ে। ফলে পেশির ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া রক্তনালীতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঘটে যায় মেসেজ। এ সময় রক্তনালী উদ্দীপ্ত হয়, দ্রুত গতি লাভ করে প্রবাহমান রক্তধারা। খুব সহজেই রক্ত পেঁৗছে যায় ব্রেইনে। মস্তিষ্কে তখন পর্যাপ্ত অক্সিজেন পেঁৗছে যায়। প্রফুল্ল মনে স্ট্রেস কমে যায়। কারণ এ সময়ে নরএড্রিনালিন ও কর্টিজল হরমোনের নিঃসরণ ঘটে সঠিক মাত্রায়। এ দুটি হরমোন স্ট্রেস নামিয়ে আনে। একই সঙ্গে এন্ডরফিনস নামক সুখী হরমোন দেহের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। দেহমনে জেগে ওঠে ঐশ্বরিক এক প্রশান্তি।

বিভিন্ন কারণে আমরা হাসি, প্রফুল্ল থাকি। মূলত এটি একটি বন্ধনের ব্যাপার। সামাজিক শিক্ষণের মাধ্যমে শিশুকাল থেকেই বৈশিষ্ট্যটি নানা আঙ্গিক থেকে আমাদের সমৃদ্ধ করে। শিশুরা এতই দুর্বল থাকে যে, দীর্ঘক্ষণ মাকে আঁকড়ে থাকতে পারে না। মা নানা কাজে ব্যস্ত থাকেন। শিশুা কাঁদলে মায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে ঠিকই। মাও নানা ছলে ভুলিয়ে শিশুকে শান্ত করেন, আবার হয়তো ডুবে যান নিজের কাজে। ডেসমন্ড মরিসের গবেষণা থেকে দেখা যায়, শিশুর প্রাণোচ্ছল হাসিতে মা শিশুর সানি্নধ্য ছেড়ে যেতে পারে না। মায়ের মনে শিশুর এই হাসি ঐশ্বরিক মায়ায় উদ্দীপ্ত করে তোলে। ফলে নিজের অজান্তেই মা বেশি সময় দেন শিশুকে। বেশি বেশি সময় কোলে তুলে তাকে আদরে-সোহাগে ভাসিয়ে দেন। এই বন্ধন যেন প্রকৃতিরই এক গোপন ধারা।

আবার অট্ট হাসিতে হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন বেড়ে যায়, রক্ত প্রবাহ গতিময়তা লাভ করে। স্কেলিটাল পেশি এ সময় সক্রিয় হয়ে ওঠে, স্নায়ুরেখার উদ্দীপনা ঘটে। একই সঙ্গে দেহে ঢোকে পর্যাপ্ত অক্সিজেন। ফুসফুসের আনাচে-কানাচে যে অবশিষ্ট দূষিত বাতাস থাকে, হাসির দাপটে তা বেরিয়ে যায়। ঈষৎ হাসি শরীরের প্রতিরক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হলেও অট্টহাসি হচ্ছে জটিল একটি প্রতিক্রিয়া। বিজ্ঞানীরা অট্টহাসির সাতটি কারণ শনাক্ত করেছেন। নিচে কারণগুলো তুলে ধরা হলো_

১. মজাদার গল্প, ২. সুঁড়সুঁড়ি ৩. জয়ের আনন্দ ৪. অপ্রত্যাশিত বস্তুর প্রাপ্তিতে বিস্ময় ৫. ভেতরগত প্রফুল্লতা ৬. লজ্জা কিংবা চিন্তা থাকা ৭. অসঙ্গত অসামঞ্জস্য প্রেক্ষাপট। এছাড়াও রয়েছে বিদ্রূপাত্মক চাপা হাসি, টেনশন চাপা দেওয়ার কৌশলপূর্ণ হাসি, নিজের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর জন্য মনে মনে হাসা, অস্বস্তিকর অবস্থা চাপা দেওয়ার জন্য মুখ চেপে হাসা। সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য হাসির সব অনুষঙ্গ মানুষের জন্য প্রয়োজন রয়েছে।

হাসির ইতিবাচক মূল্যায়ন বিবেচনা করে দেহ ও মনের সুস্থতার জন্য বিশ্বের অনেক দেশেই হাসার জন্য ক্লাব গড়ে উঠেছে। হো হো করে উচ্চঃস্বরে প্রাণখোলা হাসার প্র্যাকটিস করা হয় ওই সব ক্লাবে।

প্রাতঃভ্রমণ করতে যেয়ে অতি ভোরে সদস্যরা হাজির হয় ওই ক্লাবে, পরিবেশই স্বতঃস্ফূর্ত হাসিতে উদ্বুদ্ধ করে তাদের। এভাবেই তারা শুরু করে দিনের যাত্রা।

হাসির সময় দেহের উপরের অংশ তথা কাঁধ, বাহু, ডায়াগ্রাম, পেট এমনকি পায়ের দিকে রক্ত সংবহন ক্ষমতা বেড়ে যায়। গবেষকরা মনে করেন ১০০-২০০ বার হাসা দশ মিনেটের জগিংয়ের চেয়েও উত্তম। হাসির ইতিবাচক ফল দশ মিনিটের সীমাবদ্ধতাকেও ছাড়িয়ে যায়। উচ্চ হাসিতে পেটের পেশি উদ্দীপ্ত হয়। ফলে পেশি রিলাক্স হয়, উচ্চরক্তচাপ কমে আসে, রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়ায় গতি লাভ করে। পরিপাকতন্ত্রের কাজের ক্ষমতাও বাড়ে, হজম ক্রিয়া থাকে স্বাভাবিক। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন হাসপাতালে হাসির এই রসায়ন ও ম্যাজিকের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। তাই ব্যবস্থাপত্রে রোগীর বিনোদনমূলক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে গুরুত্বারোপ করে লিখে দেওয়া হচ্ছে, অট্ট হাসিই শ্রেষ্ঠ মেডিসিন।

No comments:

Post a Comment