Saturday, December 3, 2011
জাল টাকা
কম্পিউটারে টাকার নকশার কাজ করে কমান্ড দিলেই প্রিন্টার মেশিন থেকে বেরিয়ে আসে কড়কড়ে টাকা। কিন্তু সব টাকাই জাল। বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ ও সামগ্রী দিয়ে জাল টাকা তৈরির সময় পুলিশ ৫ অক্টোবর মো. মাসুদ রানা ওরফে নান্নুকে রাজধানীর পল্লবীর ভাড়া বাসা থেকে টাকা ও টাকা তৈরির সরঞ্জামসহ হাতেনাতে গ্রেফতার করে। ১২ অক্টোবর মাসুদ রানা ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে ঢাকার মহানগর হাকিম আদালতের বিচারক এম এ সালাম এর কাছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। পরে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে জামিন চাইলে তা নামঞ্জুর হয়। গত ২০ নভেম্বর ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালতে জামিন চাওয়া হলে বৃহস্পতিবার জামিন মঞ্জুর করেন বিচারক মো. জহুরুল হক। আদেশে বলা হয়, আসামির মাতার দুটি কিডনি নষ্ট অথচ চিকিৎসার জন্য কেউ নেই। আসামির মায়ের চিকিৎসার বিষয় বিবেচনা করে ১ মাসের জন্য ১০ হাজার ঢাকা মুচলেকায় জামিন প্রদান করা হলো। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক আইনজীবী জানিয়েছেন, আসামির পিতা ও অন্যান্য স্বজন আছে, এজাহার ও এফআইআরে পিতার নামের জায়গায় মৃত লেখা নেই। চিকিৎসার জন্য অন্য কেউ নেই সঠিক নয়। আসামি মিথ্যা তথ্য দিয়ে জামিন হাসিল করেছেন। জানা যায়, পল্লবী থানার এএস আই থানাধীন সেকশন-৭, ব্লক-বি, রোড-৮, বাসা-৪৪ এর চতুর্থ তলার পিছনের ফ্ল্যাট থেকে মো. মাসুদ রানা ওরফে নান্নুর দখল থেকে ১০০০ টাকার জাল নোট ৩৭১টি, ৫০০ টাকার জাল নোট ১৭টি, ১০০ টাকার জাল নোট ১০০টি, ১০০০ টাকা প্রিন্ট সংবলিত নোটের কাগজ মোট ২০ পিস এবং ১০০ টাকার প্রিন্ট দেওয়া ৭ পিস, ১০০০ টাকা নোট তৈরি করার কাগজ ৬৪০ পিস যাতে ১০০০ টাকার নিরাপত্তা সুতা লাগানো আছে এবং বাংলাদেশ ব্যাংক লেখা নিরাপত্তা স্টিকার যুক্ত জাল নোট তৈরির কাগজ ১ বান্ডিল জব্দ করে। এ ছাড়া জাল নোট তৈরির কাজে ব্যবহৃত সোনালি রং অনুমান ১০০ গ্রাম কেমিক্যাল এবং সিলভার রং অনুমান ২০০ গ্রাম কেমিক্যাল, নোট ছাপানোর স্ক্যানার যার প্রতিটিতে বাংলাদেশ ব্যাংক লেখা, জাল নোট তৈরির কাজে ব্যবহৃত দুটি প্রিন্টার ও একটি সিপিইউ, একটি কী বোর্ড ও একটি মাউস ও মার্কেন্টাইল ব্যাংক লিমিটেড লেখা পাঁচটি অ্যাকাউন্টের চেক বই জব্দ করা হয়।
গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে, তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে জাল নোটের মামলা হলেও অপরাধীদের যথাযথ শাস্তি হচ্ছে না। ফলে কারিগররা রয়ে যাচ্ছে পর্দার আড়ালে। এ কারণে জালিয়াতি চক্রের বিশাল সিন্ডিকেট দেশব্যাপী নিয়ন্ত্রণ করছে জাল টাকার ব্যবসা। অনেক বিদেশি নাগরিক জাল টাকা তৈরি করে সরবরাহ ও বাজারজাতকরণে জালিয়াত চক্রের সঙ্গে জড়িত রয়েছে। এ চক্রের একাধিক সদস্য র্যাব-পুলিশের হাতে জাল টাকা ও তৈরির সরঞ্জামসহ গ্রেফতার হলেও জামিনে বেড়িয়ে আবার জাল টাকার ব্যাবসা করছে। এ ছাড়া পুলিশ চার্জশিটে (অভিযোগপত্র) আসামিদের স্থায়ী ঠিকানা সঠিক দেয় না ও যে নামে গ্রেফতার করা হয় সে নাম ও বর্তমান ঠিকানা থানায় রেকর্ড করা হয়। আসল নাম ও স্থায়ী ঠিকানা আর জানা হয় না। এ সুযোগে জামিনে বেরিয়ে ঠিকানা পরিবর্তন করার পর তাদের খুঁজে পাওয়া যায় না। পরে সাজা হলেও আর সাজা কার্যকর হয় না। ফলে রাতারাতি ধনী হওয়ার স্বপ্নে মাদক ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন অবৈধ ব্যবসায়ী ও অপরাধীরা জড়িয়ে পড়ছে এ পথে।
আদালত সূত্র জানিয়েছে, যে হারে জাল টাকার মামলা হচ্ছে সে তুলনায় নিষ্পত্তির সংখ্যা অনেক কম। মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি না হওয়ায় শাস্তি হচ্ছে না। এতে অপরাধীদের মধ্যে কোনো ভয়ভীতি সৃষ্টি হচ্ছে না। প্রচলিত আইনে রয়েছে বড় ধরনের দুর্বলতা। যে কারণে আইনের প্রয়োগ কঠোরভাবে হচ্ছে না। ঢাকা আইনজীবী সমিতির একাধিক সদস্য জানিয়েছেন, জাল টাকা তৈরি চক্রের প্যানেল আইনজীবী আছে। তারা নিম্ন আদালতে ও উচ্চ আদালতে আসামিদের মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে জামিন করিয়ে থাকে। তাছাড়া রাষ্ট্র পক্ষ থেকে তেমন কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় আসামিরা সহজে জামিন পেয়ে যান বলে জানিয়েছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানান, জানুয়ারি ২০০১ থেকে ২০১১ সালের এ পর্যন্ত জাল টাকা তৈরি করে সরবরাহ ও বাজারজাত করণে জড়িতদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় ৫ হাজারের বেশি মামলা হয়েছে। গত জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে গড়ে দৈনিক একটির বেশি মামলা হয়েছে। তবে অধিকাংশ আসামিরা জামিনে আছেন।
জানা গেছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে জাল টাকা সংক্রান্ত মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য প্রজ্ঞাপন জারি বা আইন সংশোধনের মাধ্যমে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বিচার করার প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করা হয়। মন্ত্রণালয়ের আইন শাখা হত্যা, ধর্ষণ, আগ্নেয়াস্ত্র, বিস্ফোরকদ্রব্য ও মাদকদ্রব্য সংক্রান্ত মামলা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করে। এর আগে জরুরি ক্ষমতা বিধিমালা অনুযায়ী সরকার কিছু মামলা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে হস্তান্তর করে। বর্তমানে জরুরি বিধিমালার কার্যকারিতা না থাকায় এসব মামলা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে পাঠানোর সুযোগ নেই। আপাতত এসব মামলা ট্রাইব্যুনালের পরিবর্তে সাধারণ আদালতে নিষ্পত্তি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে বছরের পর বছর সময় লাগছে। এ ব্যাপারে ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর শাহ আলম তালুকদার বলেন, জামিনের বিরোধিতা করা হয়। শুনানিতে আইনগত কোনো আন্তরিকতার অভাব নেই। অপরাধ তথ্য ও প্রসিকিউশন বিভাগের সহকারী পুলিশ কমিশনার আমিনুর রহমান বলেন, জামিনের বিরোধিতার ব্যাপারে আইনি ব্যাখ্যা আদালতকে জানানো হয়।
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
No comments:
Post a Comment